অক্ষমতা যখন অস্ত্র

১৯৪৫, মে ১৭।

আজকের দিনেই ভারতে জন্মগ্রহণ করেন ভাগবত চন্দ্রশেখর নামের একজন শিশু। পোলিওমেলাইটিস দ্বারা আক্রান্ত হন শিশুকালেই। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার ডান হাতটি শুকিয়ে যায়। কিন্তু কে ভেবেছিল ঐ শুকিয়ে যাওয়া হাতটিই একদিন বিশ্বজয়ী হাত হয়ে উঠবে। প্রতিবন্ধী ছেলেটিই করবে একদিন বিশ্বজয়। কিন্তু সেই শুকিয়ে যাওয়া হাতই দিয়েছে ভারতকে অনেক ম্যাচজয়ী পারফরমেন্স।

শুকিয়ে যাওয়া হাতই একদিন হয়ে ওঠে বড় হাতিয়ার। ১৪ বছর ভারতকে তার শুকনো হাত দিয়েই দিয়ে যান সার্ভিস। ভারতের সম্ভবত প্রথম বড় ম্যাচ জয়ী বোলার তিনিই। তিনি তার ক্যারিয়ারে ২৯.৭৪ গড়ে ৬৫.৯ স্ট্রাইকরেটে ৫৮টি টেস্টে ২৪২টি উইকেট নেন। সংখ্যাটি যদিও অনেক চিত্তাকর্ষক, তবে জয়ী ম্যাচে তার পারফরমেন্স যে অনেকটা উত্তেজনাপূর্ণ তার প্রমাণ মেলে পরিসংখ্যানে। চন্দ্র তার ক্যারিয়ারের ১৪টি জয়ী ম্যাচে ৯৮টি উইকেট দখল করেন মাত্র ১৯.২৭ স্ট্রাইকরেটে। তার পারফরমেন্সই বলে দেয় তিনি কতোটা ভাল ছিলেন উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ১৪টি জয়ের মধ্যে ৫টি আবার বিদেশের মাঠে এসেছিলো। আর সেইসময় বিদেশের মাঠে ভারতের জয়কে প্রায় অসম্ভব ধরা হতো। এই সব সাফল্যের মূলরূপকার ছিলেন তিনি। এই জয়গুলি ছিল চন্দ্রের পোলিও-বিরোধী আগ্রাসন এর বিরোচিত দিক। সৃষ্টি করেছিলেন পোলিওকে জয় করার অনন্য উদাহরণ। সেই যুগের অন্যান্য তিনটি অবিশ্বাস্য স্পিনারের সঙ্গে তাকে তুলনা করা হতো।

তার পারফরমেন্স দেশে-বিদেশে এতোটাই ভাল ছিলো যে তাকে স্পিন জাদুকর বলে মজা করতেন অনেকে। ক্রিকেটের একটি প্রচলিত কথা হলো ‘হ্যান্ড অফ গড’। চন্দ্রশেখরের হাতকে সেসময় হ্যান্ড অফ গডের সাথে তুলনা করা হতো।

১৯৭৪ সালে একবার ওয়েস্টইন্ডিজ এসেছিল ভারতে। সেসময়কার সেরা ব্যাটসম্যান ধরা হতো ভিভ রিচার্ডসকে। সেবার ৫ ম্যাচের সিরিজে ভিভের মোট রান ছিল মাত্র ১৬৪ এবং ২৩.০২ গড়ে। চন্দ্রশেখরের স্পিন দাপটে তিনি খোলস ছেড়ে বের হতে পেরেছিলেন না। এছাড়াও ১৯৭১ এ ওভালে ইংল্যান্ডের সাথে, ১৯৭৫-৭৬ সিজনে নিউজিল্যান্ডের সাথে দেওয়া ম্যাচজয়ী পারফরমেন্সগুলো আজও ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় আলো ছড়ায়।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি পোলিওমেলাইটিস রোগ দ্বারা আক্রমণের শিকার হন। হাসপাতালে তিন মাস অতিবাহিত করার পর ডাক্তাররা আবিষ্কার করেছিলেন যে তার ডান হাতটি শুকিয়ে যাবে এবং ক্ষীণ হয়ে যাবে। পরবর্তীতে বয়স বাড়ার সাথে সত্যিই শুকিয়ে যায়। কিন্তু শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার লড়াই চালিয়ে যান। যার ফলে গড়ে ওঠে চন্দ্রের এমন অসম্ভবকে জয় করার অসাধারণ একটি গল্প। ১৪ বছর ঐ শুকনো হাত দিয়েই শাসন করেন বিশ্বের সব বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের। ভারতেকে দিয়ে যান কিছু অসাধারণ জয়। নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।

Leave a Reply