আরও একটি রূপকথার গল্প!

কমেন্ট্রিবক্স থেকে ভেসে আসছে “O my goodness, o my goodness “

রোসানের হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা সাথে ব্রেট লীর অবাক দৃষ্টি আর বাংলার গর্ব আতাহার আলীর চিৎকার – এ জেনো হাজারো রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়া কোনো এক সিনেমা। যার দারুণ আবেগে কেঁদেছে বাংলার ১৬ কোটি ক্রিকেট ভক্ত নেচেছে নাগিন ড্যান্স।

সিনেমার শুরু সাকিবকে দিয়ে। সাকিব যখন দলে, বাকিরা সব জেনো খুঁজে পায় নতুন আত্মবিশ্বাস। নিজেদের সাঁজায় নতুন বেশে, নতুন রঙে। তাইতো ছুটে গেলেন লংকার উদ্দেশ্যে। কাপ্তানবেশে মাঠে নামলেন অঘোষিত এক সেমিফাইনাল লড়াইয়ের জন্য। প্রতিপক্ষ স্বাগতিক শ্রীলংকা। ঠিক চারদিন আগেই মুশি- তামিমরাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো এই লংকানদের। তবুও ভাবনা পারবে কি বাংলাদেশ না আবার এখান থেকেই বিদায়? শত আশায় গ্যালারী ভর্তি দর্শক আর মাঠের বাহিরে অগণিত ক্রিকেট প্রেমী। খেলার টস ভাগ্যও ছিল সাকিবের অনেককিছু বিবেচনায় নিলেন ফিল্ডিং। চিন্তা লংকানদের আগ্রাসী ব্যাটিং এ ধ্বস নামাবে কি করে। সেই শুরুটাও তাকে দিয়েই। দলীয় ১৫ রানের মাথায় গুনাথিলাকাকে ফেরান বাংলার প্রাণ সাকিব আল হাসান। এই ১৫ থেকে ৪১ এরই মাঝে লংকানরা গুনে গুনে উইকেট খুইয়েছে পাঁচ পাঁচটি। স্কোর বোর্ড শক্ত না করেই ফিরেছেন কুশাল মেন্ডিস, থারাংগা,সানাকা আর জিভান মেন্ডিস। এযেনো বাংলাদেশের জয়োল্লাস। হয়ত ১০০ এর মাঝেই গুটিয়ে যাবে লংকানরা। তখনো মাঠে ছিলো দুই পেরেরা। লংকান দর্শকদের নিরাশ করেনি তারা। তাদের দুইজনের ব্যাটিং দৃঢতায় ২০ ওভার শেষে স্কোর দাড়ায় ১৫৯/৭।

তার মানে বাংলাদেশের লক্ষ্য ১৬০ রান।অনেকটাই স্বস্থিতে বাংলাদেশ কারণ এই লংকানদের বিরুদ্ধে ২১৪ রান তারা করে জয়ের রেকর্ড গড়েছে মাত্র দুই দিন আগেই। ব্যাটিং এ তামিম লিটন। লক্ষ্য ১৬০ রান! তবে প্রথমেই সহজকে জটিল করে দিলো লিটন যখন দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে ক্যাচ আউট হয়ে রান না করেই ফিরে আসে। সব জল্পনাকল্পনা শেষে সাব্বির আসে ক্রিজে। হাকালেন দু’তিনটে চার। মনে হয় ফিরেছে সাব্বির, জিতবে বাংলাদেশ। তা আর হলো না, দলীয় ৩৩ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ১৩ রান করেই সাজঘরে ফেরেন সাব্বির।

এরপরেই মাঠে আসেন বাংলাদেশ দলের সবথেকে নির্ভরযোগ্য মুসফিক।এবার দলের হয়ে লড়ে চলেছেন দুই জন একসাথে তামিম আর মুশফিক।যেনো যোগ্য জবাব দিয়ে চলেছেন বাংলার দুই অহংকার। হঠাৎ করেই ঝড় এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। আশার দেওয়ালে চির। খেলা হবেনা বুঝি ফাইনাল। দলীয় ৯৭ থেকে ১০৯, এর মাঝে নেই মুশফিক,তামিম আর সৌমের উইকেট। হতাশ গ্যালারী ভর্তি বাংলার দর্শক, হতাশ মাঠের বাহিরের ১৬ কোটি মুখ। কি হতে কি হয়ে গেলো! আবারো এক কষ্টের পরাজয় বুঝি হবে এখুনি।

আশা তখনো ছিলো কারণ মাঠে ছিলো বাংলার ভালবাসা, দুই কৃতি সন্তান সাকিব ও মাহমুদুল্লাহ দ্য সাইলেন্ট কিলার। কিছুদূর না যেতেই আবারো হোঁচট। সাকিবের উইকেট হারিয়ে প্রায় হারের দারপ্রান্তে বাংলাদেশ। দলীয় ১৩৭ রানের মাথায় সাজঘরে ফিরেন সাকিব তার থেকেও বেশি কষ্ট দেয় সাকিবের আউটের পর ধনাজয়ার নাগিন ড্যান্স উদযাপন। তখনো জয় থেকে ঠিক ২৩ রান দূরে, বল বাকি ১২ টা।  আশার প্রদীপ ১৬ কোটি বাঙালীর হৃদয়ের এক কোণে জ্বালিয়ে রেখেছেন দ্য সাইলেন্ট কিলার মাহমুদুল্লাহ। পেরেরার ১৯ তম ওভারে এক বাউন্ডারি, সিংগেল আর ডাবলে ১১ রান নিয়ে পঞ্চম বলে প্রান্ত বদল করে মাহমুদুল্লাহ। ১৯ তম ওভারের শেষ বল, স্ট্রাইকে মিরাজ। সকলের প্রত্যাশা হয়ত একটা বাউন্ডারি। কিন্তু রান আউটের ফাদে পরলেন মিরাজ আবার উল্টো রান নিতে গিয়ে পরের ওভারের স্ট্রাইক হারালেন মাহমুদুল্লাহ। শেষ ওভারে প্রয়োজন ১২।

কে আসবে নতুন ব্যাটসম্যান? পারবে একটা সিংগেল নিয়ে মাহমুদুল্লাহকে স্ট্রাইকে দিতে? ইস!পারবো কি আমরা! পারবে কি আমাদের মাহমুদুল্লাহ ভাই! তখনি গ্যালারি তে কিছু লংকান দর্শকের হাতে একটা প্লেকার্ডে লেখা,”Get ready to go home”। ভিতরের আগুন জেনো প্রতিটি বাঙালির বুকে জ্বলে উঠেছে। ব্যাটিং এ আসলেন মুস্তাফিজ। চাওয়া ছিলো একটি মাত্র রান নিয়ে মাহমুদুল্লাহকে স্ট্রাইক দেওয়া। ইসুরু উদানার দুই বাউন্সে দুইটাই মিস, রান নিতে গিয়ে মোস্তাফিজ রান আউট।

শুরু হয় আম্পায়ারদের পার্শেয়াল্টি। টি-২০ ভার্শনে এমন অবস্থায় পরপর দুইটা বল এতো বাউন্সের পরেও বাউন্সের সিগনালও নেই উপরি দ্বিতীয় বাউন্সের সময় লেগ আম্পায়ার নো বল দেওয়ার জন্য হাত উঠিয়েও দেন নি। সাকিব,মাহামুদুল্লাহসহ বাংলার সকলের চোখে লেগেছিলো সিদ্ধান্তগুলি।তাই সবথেকে সাইলেন্ট মানুষটিও প্রতিবাদ করতে ভুলেন নি। আর মাঠের বাহিরে সাকিবতো একপ্রকার পাগলের মতো ছুটে চলেছেন। মনে হচ্ছিলো, ইস! এমন মানুষ যে দেশের জন্য এতোটা পাগল হতে পারে। ফোর্থ আম্পায়ার এর সাথে কথা বলছেন এইটা নো বল। আবার বলছিল খেলতে হবে না, উঠে আসেন মাহমুদুল্লাহ ভাই। ইস! এমন একজন প্রয়োজন ছিলো, যে এই সময়গুলোতে প্রতিবাদ করবে। নিমিষেই চোখের পাশ বেয়ে পানি ঝড়ছে। মনটা বলছে ভালোবাসি অনেক ভাই তোরে। মনের অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে পানি পরছে।

এক রোমাঞ্চকর ঘটনা শেষে খেলা গড়ায় মাঠে। ৪ বলে প্রয়োজন ১২ রান।উদানার তৃতীয় বল। এই বুঝি বলটা এসে ১৬ কোটি বাঙালির বুকে লাগবে। মেড়েছেন, বল দুই ড্রপে সীমানা ছাড়া। চার! পরের বল এবার আর হবে না একরানের বেশি। না দ্বিতীয় রানের জন্য ছুটছেন মাহমুদুল্লাহ রান আউটের সম্ভাবনা।

কমেন্ট্রি থেকে ভেসে আসা স্বর,” He can be in trouble, he can be in trouble.O my goodness, he missed it!he missed it”.আবার এক পরিচিত কন্ঠের স্বর,”There is no matter, he is in! he is in. He has done excellent. ” মনে শান্তির সুর। এখনো টিকে আছে আমাদের সাইলেন্ট কিলার। তবুও সকলের মুখে চিন্তার ছাপ, আর বুকে হাত চেপে বসে থাকা। এই বুঝি কান্নার শোরগোল পরে যাবে। পঞ্চম বল নিয়ে আসছেন উদানা। বল করলেন, মাহমুদুল্লাহ উঠিয়ে মারলেন। আর কমেন্ট্রি থেকে ভেসে আসলো, ”O my goodness, o my goodness.” সারা বাংলা কান্নার শোরগোল। হ্যা এটা কষ্টের না,আনন্দের কান্না! প্রতিবাদের কান্না! প্রতিশোধের কান্না। মাঠে শুরু হলো সেই চিরচেনা, “নাগিন ড্যান্স। তবে এবার অপু কিংবা শুধু মুশি নয়,নাচলেন পুরো দল আর নাচালেন সারা বাংলাকে।

Leave a Reply