অধিনায়ক ধোনীকে কতোটা অনুভব করেন?

লোধা কমিশনের ঘটনা নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট টালমাটাল। ক্রিকেট মাঠের খেলার চেয়েও বেশি যেন মাঠের বাইরের খেলা, আর কয়েকদিন গেলে এই কথাও বলে দেয়া যেত। এত বড় ইংল্যান্ড সিরিজ দুই দিন পর, এটা নিয়ে কথা তেমন একটা হচ্ছে না। মাঠের বাইরের এই ঘটনা থেকে মুখ ফিরিয়ে আনার জন্য ক্রিকেটারদের কিছু না কিছু করাই লাগতো। আর ‘ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দ্যা ফ্রন্ট’ প্রদর্শন করে দায়িত্ব তুলে নিলেন এমএস ধোনি। সেটা এমনভাবেই যে, তাকে আর ক্যাপ্টেন বলা যাচ্ছে না। তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।

সব আইসিসি আয়োজিত ইভেন্ট জয়ী একমাত্র অধিনায়ক তিনি। ১৯৯ ওয়ানডে ম্যাচ নেতৃত্ব দেওয়া ভারতীয় ক্যাপ্টেন, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ী ভারতীয় ক্যাপ্টেন ইত্যাদি ইত্যাদি পরিসংখ্যান কেবল পরিসংখ্যানের পোকাদেরই আগ্রহী করবে। কিন্তু, অন দ্যা ফিল্ডের সাথে অফ দ্যা ফিল্ড ক্যাপ্টেন হিসেবে যা করেছেন, তার জন্য ইন্ডিয়া তাকে বোধহয় আরো বেশি অনুভব করবে। এক এক করে বলা যাক, কি জন্য ক্রিকেট একজন ক্যাপ্টেন কুল মহেন্দ্র সিং ধোনিকে মিস করবে।

আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘কেউ যখন একটু নতুন কিছু, ভিন্ন কিছু করে, সফলতা পাওয়ার আগ পর্যন্ত লোকে তাকে পাগলই বলে।’

এমএস ধোনিকে কেউ পাগল বলেন নি হয়তো, তবে সফলতা পাওয়ার যোগাড়যন্ত্র তিনি নিজ হাতেই তৈরি করে নিয়েছিলেন। উপমহাদেশের একজন হয়েও তিনি যেন বাইরের কেউ। একদম নতুন কিছু।

অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে যখন বিশ্বকাপগামী দল ঘোষণা করা হলো, তিনি সুযোগ পেলেন না। সবাই ভাবছেন, কেন ধোনি সুযোগ পেলেন না, মানসিকভাবে ভেঙেও পড়ছেন আত্মীয়স্বজনেরা। আর তিনি ভেবেছিলেন, প্রতিবার পিছিয়ে পড়া আরো জোরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যেই, আরো বেশি পরিশ্রম করে সেই বাধা দূর করার জন্যেই। এই হাড়ভাঙা পরিশ্রমী ক্যাপ্টেন তারা মিস করবে। দলে যখন এসেছিলেন, কিপিং ভয়াবহ রকম বাজে বলে তাকে বাদ দেওয়া নিয়ে চিন্তাভাবনাও করেছিলেন নির্বাচকেরা। সেই জায়গা থেকে তিনি কিপিংয়ের আলাদা এক ক্লাস সৃষ্টি করেছেন, এমএস ধোনি ক্লাস। সেই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই। এই ক্যাপ্টেনকে মিস না করে উপায় কি??

তার নিজের দেশ ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। ক্রিকেটবোদ্ধার সংখ্যা যদি এর চেয়ে কম ভেবে থাকেন, ভুল করবেন। সব বোদ্ধার কথা শুনে তিনি নিজেকে তৈরি করেন নি। বরং, নিজের চেনা জগতের বাইরের সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করে বারেবারে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘নিজের নিয়মে চলা’ বলে এক ব্যাপার আছে। যদি ‘নিজের নিয়মে চলা’ কোনো শিল্প হতো, এমএস ধোনি হয়তোবা কিংবদন্তির কাতারেই নাম লেখাতেন। আশেপাশের কারো কথায় কান না দিয়ে একেবারে একান্ত নিজের জগত তৈরি করে নেওয়া, বিশেষ করে উপমহাদেশের এক ছেলের রূপকথার মতো শুনাচ্ছে। ভারত এই নিজের নিয়মে চলা এক ক্যাপ্টেনকে অনুভব করবে।

২০০৮ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজের দল ঘোষণার সময় তিনি নির্বাচকদের বলেছিলেন, দলের তিন সিনিয়র ক্রিকেটার ফিল্ডিংয়ে স্লো, রান বেশি হয়ে যাচ্ছে কিছুটা। তারা বর্তমান ওয়ানডে ম্যাচের জন্য উপযুক্ত না। নতুন প্রাণ দরকার। আগামী বিশ্বকাপের কথা ভেবে হলেও। বিশ্বকাপের তিন বছর বাকি, ভাবার আরো সময় আছে। এই ধারণাকে বদলে দেয়া ক্যাপ্টেনকে মিস করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। বলার প্রয়োজন নেই, ভারত সেই ত্রিদেশীয় সিরিজের সাথে বিশ্বকাপটাও বাগিয়েছিলো।

এবার নিজের ক্যাপ্টেন্সি ছাড়ার সময় তিনি বোধহয় একই কথা ভেবেছিলেন, নতুন ক্যাপ্টেনকে পরবর্তী বিশ্বকাপের আগে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, নিজের মতো করে দলকে গুছিয়ে নেয়ার জন্য উত্তরসূরিকে সময় দেয়া, এই দূরদর্শী ক্যাপ্টেন যে আবার কবে আসবেন!

দলে এসেছিলেন বল জোরে মেরে রান বাড়ানোর জন্য। অভিজ্ঞতা ছুড়ে ফেলার পর নিজেই এগিয়ে আসেন তা ঢাকার জন্য। সিঙ্গেল ডাবলসে রানরেট ঠিক রাখার দিকে তখন দেন মনোযোগ। নিজের খেলার ধরণ পাল্টে অনায়াসে দলের স্বার্থে নিজেকে তৈরি করা সাথে এই বার্তা দেয়া, দলের জন্য যেকোনো কিছু করা লাগবে, এক ক্যাপ্টেনকে ভারত মিস করবে। শেষবেলায় আবারো একই বার্তা দিলেন, ক্যাপ্টেন্সি ছেড়ে নিজের দলে থাকাটা অন্যের হাতে সমর্পণ, এইরকম নিবেদিত অধিনায়ক দেখাটাই সৌভাগ্যের।

যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এই কথাকে বোধ হয় নিজের জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়েছিলেন। ব্যাটসম্যান হিসেবে অনেক অসম্ভব ম্যাচ তো জিতিয়েছিলেনই, ক্যাপ্টেন হিসেবেও কম নয়।বাংলাদেশি হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আপনারও হয়েছে। যতক্ষণ খেলা শেষ না হচ্ছে, জেতার সুযোগ আছে, এই হার না মানা মানসিকতার ধোনিকে ক্যাপ্টেন হিসেবে মিস করবে। এক দৃঢ় মানসিকতার ক্যাপ্টেনকে মিস করবে।

ভারতীয় ক্রিকেটের ক্ষতিটাও কম নয়। চাপের মুহূর্তে নিজেকে গুটিয়ে না নিয়ে ‘লিডিং ফ্রম দ্যা ফ্রন্ট’ ক্যাপ্টেনকে ভারত মিস করবে।

দলে নতুন এসে পারফর্ম করতে না পারলে, আশ্রয় হিসেবে একজন ক্যাপ্টেন, একজন বড় ভাই তারা মিস করবেনই। টেন্সড ম্যাচে একজন যোগিন্দর শর্মা অনুভব করবেন এই কথাগুলো, you have bowled so many bowls in domestic cricket with so much dedication when no one is watching. Don’t worry, cricket won’t let you down now.

পেশাগত জীবনে আবেগের জায়গা কম। উইকেটের পিছনে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এক মাস্টারমাইন্ড ক্যাপ্টেনকে তাদের মিস করাই লাগবে। বোলারকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া, সে অনুযায়ী বল করতে না পারলেও বোলারের উপর বিরক্ত না হওয়া, ক্যাপ্টেন্সি এমনই, এই ধারণা দেয়া ক্যাপ্টেন শুড বি মিসড।

আসলে এতসব কিছুই না। দিনশেষে একজন ‘ক্যাপ্টেন কুল’কেই আপনি মিস করবেন। চুল নিয়ে নিত্যনতুন ছেলেখেলা করা একজন ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিং ধোনিকেই আপনি মিস করবেন।

Leave a Reply