কাঁদছেন কেন? হাসুন

ও মা! এখনও মুখ ভার করে আছেন? থামুন, হাসুন। একটু হাসুন, জোরে হাসুন, পারলে নচিকেতার “তুমি আসবে বলে” গানটা শুনে নিন, ধরে নিন, গানটা আমাদের জন্যই লেখা।

তবু মন খারাপ? চোখটা একটু বন্ধ করুন, ফ্ল্যাশব্যাকে যান। সিরিজ শুরুর আগে ভেবেছিলেন, আমরা ফাইনাল খেলবো? শ্রীলংকার সাথে ২১৫ রান তাড়া করে জিতবো, যেখানে সেই মুশফিক যাকে আমরা টি২০ এর অযোগ্য ঘোষণাই করে ফেলেছিলাম, তিনি অতিমানব হয়ে ৩৫ বলে ৭২ করে বেঙ্গালুরুর পাপমোচন করবেন?

বা, ৬ বলে ১২ রান লাগবে, সেখান থেকে আম্পায়ারদের অবিচারের প্রতিবাদে আমাদের অধিনায়ক বলবেন, চলে আসো, খেলবো না? বা সেখান থেকে ফিরে গিয়ে ৩ বলে ১২ রান নিয়ে নিজেও বেঙ্গালুরুর শাপমোচন করবেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ?

ভারতের সাথে দুই ম্যাচ হারার পর জেতার আশা নিশ্চয়ই করেননি? তাহলে?

সাব্বিরের ইনিংসটা দেখুন না। ছেলেটা কতদিন অফ ফর্মে, কয়দিন আগেই নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে গেলো, শ্রীলংকার সাথে ২১৫ চেজ করতে গিয়ে হারলে ভিলেন হওয়ার কাঠগড়ায় এই ছেলেটাই ছিলো। সেই ছেলেটা কি একটা মাস্টারক্লাস ইনিংস খেললো! টপ অর্ডার ধ্বসে পড়ার পর, কিভাবে একাই টেনেছে। মাহমুদুল্লাহের সাথে ভুল বোঝাবুঝিটার জন্য অবশ্য একটু গালি খেতেই পারেন, কিন্তু তবুও কি অসাধারণ ব্যাটিং। দেখে বারবার মনে হচ্ছিলো, একেই তো চাই, একেই তো দরকার…

বা লাস্টে মিরাজের ক্যামিওটা! অলরাউন্ডার ছেলেটার জাতীয় দলে ঢোকার পর থেকেই ব্যাটিং সত্ত্বার বড় অভাব! টি২০তে মিরাজ কেন খেলবে? এই প্রশ্নের জবাবটাও তো কালকে দিয়েই দিলো ছেলেটা, আর কি চাই!

বা দেখুন সাকিবকে, যে কিনা ফুল ফিট না হয়েই খেলার দুঃসাহস দেখিয়েছে। ব্যাটিং এর সময় সাকিবকে দেখে আমার কান্না পাচ্ছিলো, হাত নাড়াতে পারছে না, তবুও, তাকে খেলতে হবে। আর, কি অসাধারণ অধিনায়কত্ব টাই না করলেন! হারা ম্যাচ হাতে নিয়ে আসলেন, বোলিংটাও করলেন অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে, যেন এক রাজা যুদ্ধে নেমেছেন, তিনি হারতে রাজি না।

মুস্তাফিজকেও দেখতে পারেন। ইঞ্জুরি থেকে ফেরার পর ছন্দটা ঠিক নেই, বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন। এই টুর্নামেন্টে উইকেট পাচ্ছিলেন, কিন্তু রান দিচ্ছিলেন প্রচুর। সেই মুস্তাফিজ কাল যেন মিডাসের বাম হাত নিয়ে নামলেন, বিশেষত শেষ ওভারটায়। ১৮তম ওভারে এসে ৪ ডট, ১ লেগ বাই, ১ উইকেট। এরকম সোনার ছেলে কয়জন পায় বলেন?

রুবেলের দিকে তাকান না, বেচারা ২০০৯ এর ক্ষত বুকে নিয়ে ২০১০ এ বাংলাওয়াশে কাইল মিলসকে বোল্ড করে ব্যথা কমিয়েছিলো, ক্ষত দূর করেছে বিশ্বকাপে এন্ডারসনকে বোল্ড করে। বারবার আমাদের ডেথ ওভারে নির্ভরযোগ্য হাত, একটা খারাপ ওভারেই সব বদলে যায় না, নাহ! সে যে আগের ৩ ওভারে ১৩ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে আমাদের ম্যাচে রাখলো, সে কথা আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম? সাকিবের সাথে গলা মিলিয়ে বলছি, প্রতিটা বার এই সিচুয়েশনে আবার রুবেলকে বল দেবো, আবার!

আর, সৌম্য। বাংলাদেশের মানুষ যাকে দলে দেখতে না পারলেই বাচে। সেই সৌম্য কাল ডেথে বল করলেন, ৩ ওভারে ৩৩ রান দিয়ে ১ উইকেট নিলেন। এখানেই ফাকি, এই স্কোরকার্ড যে মস্ত বড় গর্দভ, তার প্রমাণ সৌম্যের এই স্পেল। স্কোরকার্ডে কার্তিকের শেষ বলের ছয়টা দেখাবে, দেখাবে না কিভাবে একজন সিংহহৃদয় সাধারণ মানের ডিবলি ডবলি অনন্য হয়ে উঠেছিলেন, কিভাবে মাথা আর শরীরের উপর প্রচন্ড প্রেশার নিয়ে বলের পর বল করে গেছেন, কিভাবে মিডিওকোর এক পেস বোলিং অলরাউন্ডার থেকে একজন অনন্য অসাধারণ সৌম্য হয়ে গেছেন। শেষ বলটায় ছয় খেয়ে যে মাঠেই কান্নায় লুটিয়ে পড়ে, তবে আমি জানি, সৌম্যের জেদ চেপেছে এই ছয় খেয়ে, সে ফিরবেই, আগের চেয়ে অনেক বেশী রাগ নিয়ে, অনেক বেশী আগুন নিয়ে, যাতে সবাই পুড়ে যাবে, সবাই।

কাদছেন কেন? আমাদের ১১টা বীর আছে, যারা ৩৫ হাজার দর্শক ভরা প্রেমাদাসা যখন রোমান কলোসিয়াম হয়ে গেলো, তখনও তারা বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন, আম্পায়ার কমেন্টেটরদের বিরুদ্ধচারণাও যাদের পা টলাতে পারেনি, একদল ক্ষুধার্ত সিংহ যখন জোট পাকিয়ে তাদের দিকে তেড়ে গেছে তখন তারা বারবার মরতে গিয়েও তারা মরেনি, ফিরে এসে মরণকামড় বসিয়ে দিয়েছে, বারবার, শুধু শেষে একবার হয়নি, এই যা! পরেরবার হবে! ধরে নিন কার্তিকের ওই বলটা মাটিতে পড়েইনি!

একটা কথা মনে রাখুন, একটা একটা করে যে কাছের ম্যাচ, ফাইনালগুলো যাচ্ছে, মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে একটা ফাইল খুলে সবগুলোর হিসেব রেখে যাচ্ছেন একজন, আমি জানি, একদিন তিনি সবকিছু ফিরিয়ে দেবেন, তখন আপনি আমি কাদবো, ইচ্ছেমত কাদবো, খুশীতে, আনন্দে, দেখবেন!

ততক্ষণ বারবার এই বীরদের পাশে থাকুন, আর শিরোপার উদ্দেশ্যে গাইতে থাকুন,

“তুমি আসবে বলে পাড়ার মেয়েরা মুখ করে আছে ভাড়
তুমি আসবে বলে ঈশান কোনেতে জমেছে অন্ধকার

তুমি আসবে বলে বখাটে ছেলেটা শিষ দিতে দিতে দেয়নি
তুমি আসবে বলে আমার কলম এখনও বিক্রি হয়নি

তুমি আসবে বলেই”

Leave a Reply